বাবার লেখা গায়ত্রী মন্ত্রের প্রতিপাদ্য় এবং এই ভাবেরই বিভিন্ন প্রকাশ আমার সংগ্রহে ছিল ।সকলের জ্ঞাতার্থে প্রকাশ করলাম। লক্ষ্যণীয় পাশ্চাত্য় কবি এবং দার্শনিকেরাও মূলতঃ একই ধারনা পোষণ করেন।
ओं भूर्भुवःस्वः तत् सबितुः वरेण्यं भरगोदेवस्य धीमहि धियोयनः प्रचोदयात्
भूर्भुवःस्वः - এই অংশ মূল বেদে নেই, তবে পূর্বে পড়া হয়।
ভূঃ - পৃথিবী; ভুবঃ - পরলোক; স্বঃ - স্বর্গ ।
গায়ত্রী প্রতিপাদ্য় পরম ব্রম্হ - ত্রিলোকব্য়াপি - এই জন্য় ত্রিলোকের নাম করা হয়।
মূল গায়ত্রীর অণ্বয় - অর্থসহ
দেবস্য় সবিতুঃ - সাবিত্রী ( সূর্য ) দেবতার
বরেণ্য়ং ভর্গঃ - বরণীয় জ্য়োতির
ধীমহি - ধ্য়ান করি
যো - যাহা, নঃ - আমাদের, ধিয়ঃ - বুদ্ধিকে, প্রচোদয়াৎ - প্রেরিত করিবে ( পরম ব্রম্হে নিয়োযিত করিবে)
সেই বরণীয় জ্য়োতির ধ্য়ান করি, যেই জ্য়োতি আমাদের চিন্তা, বুদ্ধিকে পরম ব্রম্হে নিয়োযিত করিবে।
দৃশ্য়ের ভিতর দিয়া অদৃশ্য় অচিন্ত্য়নিয় পরমসত্তায় চিত্তনিবেশন।
The beginning of wisdom consists in looking fixedly at things till they become transparent - Carlyle (Sartor Resartus)
বস্তুজগতের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে তাকালে তা স্বচ্ছ হয়ে যায় যাতে তার আভ্য়ন্তরীণ আত্মাকে দেখা যায়।
Thus on the roaring loom of time I ply,
And weave for God the garment thou seest Him by - Goethe (Faust)
হিরণ্ময়েন পাত্রেণ সত্য়স্য়াপিহিতং মুখম্
তৎ ত্বং পূষণ অপাবৃণু সত্য় ধর্মায় দৃষ্টয়ে - ঈষোপনিষদ্
হিরণ্ময় পাত্র - অস্তগামী সূর্য
তুমি সেই আবরণ মোচন কর, যাতে সত্য়ধর্ম, সত্য়কে দেখতে পাই।
এই বধির যবনিকা তুলিয়া মোরে প্রভু দেখাও তব চির আলোকলোক - রজনীকান্ত সেন
আমরা সমস্ত ঘটনাকে কেবল বাহ্য ঘটনা বলেই দেখি। তাতে আমাদের কোনো আনন্দ নেই। পাথরের নুড়ির ওপর দিয়ে যেমন স্রোত চলে যায় সেই রকম করে জগতস্রোত আমাদের মনের উপর দিয়ে অবিশ্রাম বয়ে যাচ্ছে। চিত্ত তাতে সাড়া দিচ্ছে না, চারিদিকের দৃশ্যগুলো তুচ্ছ এবং দিনগুলো অকিঞ্চিতকর হয়ে দেখা দিচ্ছে। সেইজন্য কৃত্রিম উত্তেজনা এবং নানা বৃথা কর্মসৃষ্টি দ্বারা আমরা চেতনাকে জাগিয়ে রেখে তবে আমোদ পাই।যখন কেবল ঘটনার দিকে তাকিয়ে থাকি তখন এই রকমই হয় । সে আমাদের রস দেয় না, খাদ্য় দেয় না। তার যেটুকু রস আছে তা উপরের থেকেই শুকিয়ে আসে, তা আমাদের গভীরতর চেতনাকে উদ্বোধিত করে না। সূর্য উঠছে ত উঠছেই, নদী বইছে ত বইছেই, গাছপালা বাড়ছে ত বাড়ছেই, প্রতিদিনের কাজ নিয়ম মত চলছে ত চলছেই। সেইজন্য এমন কোনো দৃশ্য় দেখতে ইচ্ছে করি যা প্রতিদিন দেখি নে, এমন কোনো ঘটনা জানতে কৌতূহল হয় যা আমাদের অভ্যস্ত ঘটনার সঙ্গে মেলে না।
কিনতু সত্যকে যখন জানি তখন আমাদের আত্মা পরিতৃপ্ত হয়। সত্য চিরনবীন, তার রস অক্ষয়। সমস্ত ঘটনাবলির মাঝখানে সেই অন্তরতম সত্যকে দেখলে দৃষ্টি সার্থক হয়। তখন সমস্তই মহত্বে বিস্ময়ে অনান্দে পরিপুর্ন হয়ে ওঠে। ঘটনাপুঞ্জের মাঝখানে যিনি এর মুলশক্তি তাঁকে দর্শন করবার জন্য়ে দৃষ্টিকে অন্তরে ফেরাই।তখন দৃষ্টি থেকে জড়ত্বের আবরণ ঘুচে যায়; জগত তখন একটা যন্ত্রের মতো আমাদের অভ্যাসের কক্ষ জুড়ে পড়ে থাকে না। তখন অগ্নি জল ওষধি বনস্পতির মাঝখানে দাঁড়িয়ে বলতে পারি, অনন্ত সত্য, অনন্ত জ্ঞান, অনন্ত ব্রহ্ম, সর্বত্রই আনন্দরূপে অমৃতরূপে তাঁর প্রকাশ । অগণ্য ঘটনাকে অগণ্য ঘটনারূপে দেখেই চলে যাব না; তার মাঝখানে অনন্ত সত্যকে স্থির হয়ে স্তব্ধ হয়ে দেখব, এই জন্য আমাদের ধ্যানের মন্ত্র গায়ত্রী:
ओं भूर्भुवःस्वः तत् सबितुः वरेण्यं भरगोदेवस्य धीमहि धियोयनः प्रचोदयात्
ভূলোক, ভুবর্লোক, স্বর্লোক, ইহাই যিনি নিয়ত সৃষ্টি করছেন, সেই দেবতার বরণীয় শক্তিকে ধ্য়ান করি - যিনি আমাদের ধীশক্তিকেও নিয়ত প্রেরণ করছেন।
************************************************শান্তিনিকেতন, সত্যকে দেখা, পৃ ১৫৮
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন